বোলার, তোমার কবে ওই দিন
আনুষ্ঠানিক কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল না। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চতুর্থ আসরের উদ্বোধন হলো রহস্য স্পিনারের সগৌরব পুনরাভির্বারের মাধ্যমে।
অজন্তা মেন্ডিসের বলে জিম্বাবুইয়ানদের এমন হাবুডুবু খেতে দেখে ৩৬ ছুঁই-ছুঁই দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক খুবই অবাক। ‘আরে, প্রযুক্তির এই যুগে রহস্য-টহস্য কিছু বলে অবশিষ্ট থাকে নাকি! ভিডিওতে বোলারদের কেটেছিঁড়ে সব জারিজুরিই ফাঁস করে দেওয়া যায়।’ ‘ক্যারম বল’ নামে যে ব্রহ্মাস্ত্রটি অজন্তা মেন্ডিসেরই আবিষ্কার বলে মোটামুটি স্বীকৃত, পাকিস্তানের চিলতে মাঠে, রাস্তায় টেপ টেনিস ক্রিকেটে তা ৩০-৩৫ বছর আগে থেকেই সবাই দেখে অভ্যস্ত বলেও দাবি তাঁর। সেই দাবি উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ ওই দাড়িওয়ালা লোকটিই অফ স্পিন বোলিংকে অন্য স্তরে তুলে নেওয়ার মূল কারণ ‘দুসরা’র আবিষ্কারক। সাকলায়েন মুশতাক যখন অফ স্পিন বোলিং নিয়ে কথা বলেন, সেটি উৎকর্ণ হয়েই শুনতে হয়। অজন্তা মেন্ডিসের ৮ রানে ৬ উইকেট নেওয়ার বিস্ময়কর কীর্তিতে জিম্বাবুইয়ান ব্যাটসম্যানদের ‘গাধামি’ কতটা দায়ী, সেই বিচারে না হয় না-ই যাওয়া হলো। যা হয়েছে, ভালোই হয়েছে। ব্যাটিং-ঝড়ের প্রতিশব্দ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বিশ্বকাপের সূচনাটা তো এতে ব্যতিক্রমী হলো। ব্যতিক্রমী, কারণ টি-টোয়েন্টিতে বোলারদের এমন দিন খুব বেশি আসে না। বরং উল্টোটাই হয়। টি-টোয়েন্টি সব ক্রিকেটারের জন্যই নতুন এক চ্যালেঞ্জের নাম। ইনিংসে বল মাত্র ১২০টি, ব্যাটসম্যানদের ১২০ স্ট্রাইক রেটও এখানে তাই কখনো কখনো কাঠগড়ায় ওঠে। তবে ব্যাটসম্যানদের আর যা-ই হোক, অপদস্থ হতে হয় না। মারার চেষ্টা করে আউট হওয়াটাও যে টি-টোয়েন্টিতে বীরোচিত ব্যাপার। কিন্তু বোলারদের জন্য এ শুধু চরম পরীক্ষাই নয়, পদে পদে অপদস্থ হওয়ার ভয়। বেশির ভাগ টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই শেষ পর্যন্ত ভিলেন কোনো না কোনো বোলার। গত সোমবার আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে মাহমুদউল্লাহই যেমন। হিসাবটা খুব সহজ—তাঁর এক ওভার থেকে পল স্টার্লিং ২৪ রান তুলে নিলেন বলেই না বাংলাদেশ ৫ রানে হারল! টি-টোয়েন্টিতে বল হাতে নিয়ে বোলারদের মনে তাই একটা ভয় কাজ করতে বাধ্য। সেই ভয় জয় করে মানসম্মান নিয়ে বেরিয়ে আসার টোটকাটা কী? মাহমুদউল্লাহ বললেন, ‘কোচ আমাদের একটা কথাই বলেন, মার খেলেও মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।’ সেটা তো সবাই জানে, কিন্তু জানলেই তো হবে না। ওভারের প্রথম দু-তিনটা বলে যখন ছক্কা হয়ে যায়, তখন তো মাথাও আগুনগরম হয়ে যাওয়ার কথা। মাথা ঠান্ডা রাখার উপায় কী? ‘বলতে পারেন, মানসিক শক্তি।’ মাহমুদউল্লাহ তাঁর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় নিগ্রহের ঘটনাটা থেকেই উদাহরণ দিতে চাইলেন। প্রথম তিন বলে ছক্কায় ছোট মাঠের বড় ভূমিকা আছে বলে তাঁর দাবি। তার পরও মাথা ঠান্ডা রেখে পরের তিনটি বল ওয়াইড ইয়র্কার করতে পেরেছেন বলে তা থেকে ‘মাত্র’ ৮ রান এসেছে। মাশরাফি বিন মুর্তজার কাছে একটা মন্ত্র আছে। সেই মন্ত্রের নাম—‘পরের বল’। ‘টি-টোয়েন্টি এমন একটা খেলা, যাতে প্রথম দুই বলে ছয় খেলেও পরের বলটা ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারে। বোলার হিসেবে তাই আগে কী হয়েছে ভুলে গিয়ে শুধু পরের বলটা নিয়ে ভাবতে হবে।’ তবে পরের বলটা ঠিকমতো করার জন্য অনুশীলনে ঘাম ঝরানোর কোনো বিকল্প দেখেন না মাশরাফি, ‘ব্যাটসম্যান মারতে থাকলে ঠেকানোর দুটিই পথ—হয় ইয়র্কার নয় স্লোয়ার বাউন্সার। এসব খুব ভালো করে প্র্যাকটিস করতে হবে।’ এত সব কিছু করার পরও কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেকোনো বোলারই যেকোনো দিন তরবারির নিচে পড়তে পারে। দুবারের কথা মাশরাফির খুব মনে আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় আইপিএলে কেকেআরের শেষ ম্যাচটায় সুযোগ পেয়ে শেষ ওভারটার দুঃস্বপ্ন হয়ে যাওয়া। অন্যটি অবশ্য ওয়ানডেতে। আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ ওভারে ব্রেন্ডন টেলরের হাতে মার খেয়ে বাংলাদেশকে হারিয়ে দেওয়া। ‘আইপিএলেরটাও খারাপ লেগেছিল। তবে জিম্বাবুয়ের মতো এত কষ্ট পাইনি। ক্লাব আর দেশ তো এক না। আমার কারণে দেশ হেরে গেছে—এটা খুব কষ্ট দিয়েছিল।’ টি-টোয়েন্টিতে বোলিংয়ের সময় তাঁর মতো বাকি সব বোলারের মনেও একটা ভয় কাজ করে বলে মাশরাফির ধারণা, ‘এটা তো টিম গেম। আমার একটা বাজে ওভারের জন্য দল হেরে যেতে পারে—এটা তো মনে হয়ই। আর অনেক সময় একটা ওভারই টি-টোয়েন্টি ম্যাচের চেহারা বদলে দেয়।’ বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ স্পিনার আবদুর রাজ্জাক শুধু টি-টোয়েন্টি না, সব ধরনের ক্রিকেটেই যে বোলারদের কাজটা আরও কঠিন করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে, সেটি মনে করিয়ে দিলেন প্রথমেই। ‘এই যে ওয়ানডেতে নতুন আইন হচ্ছে, আগে পাঁচজন বৃত্তের বাইরে থাকতে পারত, এখন থাকবে চারজন। হ্যাঁ, ওভারে দুটি বাউন্সার থাকবে। কিন্তু তাতে স্পিনারদের কী লাভ?’ টি-টোয়েন্টিতে বোলারদের, বিশেষ করে স্পিনারদের একটা নীতি মেনে চলা খুবই আবশ্যিক বলে মনে করেন রাজ্জাক, ‘এখানে এক্সপেরিমেন্টের কোনো জায়গা নেই। সামান্য এদিক-ওদিক হলেই তো চার-ছয়।’ মাহমুদউল্লাহও একমত। সাকলায়েনের কাছ থেকে ‘দুসরা’ শিখেছেন, কিন্তু সেটি নিখুঁতভাবে করার আত্মবিশ্বাস এখনো হয়নি বলে এই বিশ্বকাপে সেটি করার কথা কল্পনায়ও আনছেন না। টি-টোয়েন্টির অগ্নিপরীক্ষায় মানমর্যাদা রক্ষায় নানা বোলারের নানা টোটকা আছে। তবে সবকিছুর পর বোধহয় ভাগ্য। কারও ভাগ্যে অপদস্থ হওয়ার কথা লেখা থাকলে কিছুতেই কিছু হয় না। নইলে এত সব খণ্ডকালীন বোলার পার পেয়ে গেলেন, আর টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে খরুচে দুটি ওভার নাকি বিশেষজ্ঞ দুই বোলারের! আরেকটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এসে স্টুয়ার্ট ব্রডের নিশ্চয়ই মনে পড়ছে সেই দুঃস্বপ্নের কথা—২০০৭ বিশ্বকাপে তাঁর ছয় বলেই যুবরাজ সিংয়ের ছয় ছক্কা! ওয়েইন পারনেলের লজ্জাটা তো আরও টাটকা। ইংল্যান্ডের জস বাটলার তাঁর এক ওভারে ৩২ রান নিলেন তো সপ্তাহ খানেক আগেই। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও নিশ্চয়ই কাউকে না-কাউকে ‘ব্রড’ বা ‘পারনেল’ বানানোর অপেক্ষায় আছে।


